১২. ছালাতুল ইস্তেখা-রাহ (صلوة الإسةخارة)


১২. ছালাতুল ইস্তেখা-রাহ (صلوة الإسةخارة)

আল্লাহর নিকট থেকে কল্যাণ ইঙ্গিত প্রার্থনার জন্য যে নফল ছালাত আদায় করা হয়, তাকে ‘ছালাতুল ইস্তেখা-রাহ’ বলা হয়। কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থায় কোন্ শুভ কাজটি করা মঙ্গলজনক হবে, সে বিষয়ে আল্লাহর নিকট থেকে ইঙ্গিত পাওয়ার জন্য বিশেষভাবে এই ছালাত আদায় করা হয়। কোন দিকে ঝোঁক না রেখে সম্পূর্ণ নিরাবেগ ও খোলা মনে ইস্তেখারার ছালাত আদায় করবে। অতঃপর যেদিকে মন টানবে, সেভাবেই কাজ করবে। এ জন্য ফরয ছালাত ব্যতীত ইস্তেখারার নিয়ত সহ দু’রাক‘আত নফল ছালাত দিনে বা রাতে যেকোন সময়ে পড়া যায়।

ইস্তেখারার দো‘আ এক রাক‘আত বিশিষ্ট বিতর ছালাতে পড়া উচিৎ নয়। বরং এক-এর অধিক রাক‘আত বিশিষ্ট বিতরে বা যে কোন সুন্নাত-নফলে পড়া যায়। [1]

জাবের (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) আমাদেরকে সকল কাজে ‘ইস্তেখা-রাহ’ শিক্ষা দিতেন, যেভাবে তিনি আমাদেরকে কুরআনের সূরা শিক্ষা দিতেন। তিনি বলেছেন, তোমদের কেউ যখন কোন কাজের সংকল্প করবে, তখন ফরয ব্যতীত দু’রাক‘আত ছালাত আদায় করবে। অতঃপর বলবে।-

اَللَّهُمَّ إِنِّيْ أَسْتَخِيْرُكَ بِعِلْمِكَ، وَأَسْتَقْدِرُكَ بِقُدْرَتِكَ، وَأَسْأَلُكَ مِنْ فَضْلِكَ الْعَظِيْمِ، فَإِنَّكَ تَقْدِرُ وَلاَ أَقْدِرُ وَتَعْلَمُ وَلاَ أَعْلَمُ، وَأَنْتَ عَلاَّمُ الْغُيُوْبِ، اَللَّهُمَّ إِنْ كُنْتَ تَعْلَمُ أَنَّ هَذَا الْأَمْرَ خَيْرٌ لِّيْ فِيْ دِيْنِيْ وَمَعَاشِيْ وَعَاقِبَةِ أَمْرِيْ فَاقْدِرْهُ لِيْ وَيَسِّرْهُ لِيْ ثُمَّ بَارِكْ لِيْ فِيْهِ، وَإِنْ كُنْتَ تَعْلَمُ أَنَّ هَذَا الْأَمْرَ شَرٌّ لِّيْ فِيْ دِيْنِيْ وَمَعَاشِيْ وَعَاقِبَةِ أَمْرِيْ فَاصْرِفْهُ عَنِّيْ وَاصْرِفْنِيْ عَنْهُ وَاقْدِرْ لِيَ الْخَيْرَ حَيْثُ كَانَ ثُمَّ أَرْضِنِيْ بِهِ، قَالَ: (وَيُسَمِّي حَاجَتَهُ)- رواه البخارىُّ-

উচ্চারণ : আল্লা-হুম্মা ইন্নী আস্তাখীরুকা বি‘ইলমিকা ওয়া আস্তাক্বদিরুকা বি ক্বুদরাতিকা, ওয়া আসআলুকা মিন ফাযলিকাল ‘আযীম। ফাইন্নাকা তাক্বদিরু ওয়া লা আক্বদিরু, ওয়া তা‘লামু ওয়া লা আ‘লামু, ওয়া আনতা ‘আল্লা-মুল গুয়ূব। আল্লা-হুম্মা ইন কুনতা তা‘লামু আন্না হা-যাল আমরা খায়রুল লী ফী দ্বীনী ওয়া মা‘আ-শী ওয়া ‘আ-ক্বিবাতি আমরী, ফাক্বদিরহু লী ওয়া ইয়াসসিরহু লী; ছুম্মা বা-রিক লী ফীহি। ওয়া ইন কুনতা তা‘লামু আন্না হা-যাল আমরা শার্রুল লী ফী দ্বীনী ওয়া মা‘আ-শী ওয়া ‘আ-ক্বিবাতি আমরী, ফাছরিফহু ‘আন্নী ওয়াছরিফনী ‘আনহু, ওয়াক্বদির লিয়াল খায়রা হায়ছু কা-না, ছুম্মা আরযিনী বিহী।

অনুবাদ : হে আল্লাহ! আমি তোমার নিকট তোমার জ্ঞানের সাহায্যে কল্যাণের বিষয়টি প্রার্থনা করছি এবং তোমার শক্তির মাধ্যমে (সেটা অর্জন করার) শক্তি প্রার্থনা করছি। আমি তোমার মহান অনুগ্রহ ভিক্ষা চাইছি। কেননা তুমিই ক্ষমতা রাখ। আমি ক্ষমতা রাখি না। তুমিই জানো, আমি জানি না। তুমিই যে অদৃশ্য বিষয় সমূহের মহাজ্ঞানী।

হে আল্লাহ! যদি তুমি জানো যে, এ কাজটি আমার জন্য উত্তম হবে আমার দ্বীনের জন্য, আমার জীবিকার জন্য ও আমার পরিণাম ফলের জন্য, তাহ’লে ওটা আমার জন্য নির্ধারিত করে দাও এবং সহজ করে দাও। অতঃপর ওতে আমার জন্য বরকত দান কর।

আর যদি তুমি জানো যে, এ কাজটি আমার জন্য মন্দ হবে আমার দ্বীনের জন্য, আমার জীবিকার জন্য ও আমার পরিণাম ফলের জন্য, তাহ’লে এটা আমার থেকে ফিরিয়ে নাও এবং আমাকেও ওটা থেকে ফিরিয়ে রাখ। অতঃপর আমার জন্য মঙ্গল নির্ধারণ কর, যেখানে তা আছে এবং আমাকে তা দ্বারা সন্তুষ্ট কর’।

এখানে হা-যাল আমরা (এই কাজ) বলার সময় কাজের নাম উল্লেখ করা যায় বলে রাবী বর্ণনা করেন। যা উপরোক্ত হাদীছের শেষে বর্ণিত হয়েছে। [2]

দো‘আর সময়কাল :

এখানে দো‘আটি কখন পড়বে, সে বিষয়ে দু’টি বিষয় প্রতিভাত হয়। ১. জাবের (রাঃ) বর্ণিত বুখারীর হাদীছে এসেছে ثُمَّ لْيَقُلْ ‘অতঃপর সে যেন বলে’। এতে বুঝা যায় যে, সালাম ফিরানোর পরে দো‘আ করবে। ২. একই রাবী বর্ণিত আবুদাঊদের হাদীছে এসেছে وَلْيَقُلْ ‘এবং সে যেন বলে’। এতে বুঝা যায় যে, ছালাতের মধ্যে দো‘আ করবে। [3] অন্যান্য ছহীহ হাদীছে এসেছে যে, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) ছালাতের মধ্যেই বিশেষ করে সিজদায় এবং শেষ বৈঠকে তাশাহহুদ ও সালামের মধ্যবর্তী সময়ে বিশেষ দো‘আ সমূহ করতেন।[4] সে হিসাবে ইস্তেখারাহর দো‘আটিও শেষ বৈঠকে বসে ধীরে-সুস্থে করা বাঞ্ছনীয়। আর যদি সালাম ফিরানোর পরে উক্ত দো‘আ করেন, তাহ’লে বেশী দেরী না করে এবং অহেতুক কোন কথা না বলে সত্বর দু’হাত উঠিয়ে দো‘আ করবেন এবং শুরুতে হাম্দ ও দরূদ পাঠ করবেন। যেমন আল-হামদুলিল্লাহি রবিবল ‘আ-লামীন, ওয়াছছালাতু ওয়াসসালামু ‘আলা রাসূলিল্লাহিল কারীম, অতঃপর দো‘আ পাঠ করবেন। [5]

ছাহেবে মির‘আত বলেন, ইস্তেখারাহর পরে যেটা প্রকাশিত হয় বা ঘটে যায়, সেটাই করা উচিৎ। এজন্য তাকে ঘুমিয়ে যাওয়া এবং স্বপ্ন দেখা বা কাশ্ফ হওয়া অর্থাৎ হৃদয় খুলে যাওয়া শর্ত নয়।[6]

একটি বিষয়ের জন্য একবার ব্যতীত একাধিকবার ‘ছালাতুল ইস্তেখা-রাহ’ আদায়ের কথা স্পষ্টভাবে কোন ছহীহ হাদীছ দ্বারা প্রমাণিত নয়। তবে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) কখনো দো‘আ করলে একই সময়ে তিনবার করে দো‘আ করতেন এবং কিছু চাইলে তিনবার করে চাইতেন।[7]

এই ছহীহ হাদীছের উপরে ভিত্তি করে ইস্তেখারাহর দো‘আ পাঠের উদ্দেশ্যে অত্র ছালাত ইস্তিসক্বার ছালাতের ন্যায় একাধিকবার পড়া যায় বলে ইমাম শাওকানী মন্তব্য করেছেন। ইমাম নববী বলেন, উক্ত দো‘আ পাঠের সময় হৃদয়কে যাবতীয় ঝোঁক প্রবণতা হ’তে খালি করে নিতে হবে এবং সম্পূর্ণরূপে আল্লাহর উপরে তাওয়াক্কুল করতে হবে। নইলে ঐ ব্যক্তি আল্লাহর নিকটে কল্যাণপ্রার্থী না হয়ে বরং নিজের প্রবৃত্তির পূজারী হিসাবে গণ্য হবে। [8]

[1] . নায়লুল আওত্বার ৩/৩৫৪, ‘ইস্তেখা-রাহ্’র ছালাত’ অনুচ্ছেদ। [2] . অথবা বলবে, (فِىْ عَاجِلِ أَمْرِي وَآجِلِهِ অর্থাৎ আমার ইহকাল ও পরকালের জন্য)। বুখারী, মিশকাত হা/১৩২৩ ‘ঐচ্ছিক ছালাত’ অনুচ্ছেদ-৩৯; আবুদাঊদ হা/১৫৩৮; মির‘আত ৪/৩৬২। [3] . বুখারী হা/১১৬২, আবুদাঊদ হা/১৫৩৮; মির‘আত ৪/৩৬২। [4] . মুসলিম, মিশকাত হা/৮৯৪, ৮১৩। [5] . আবুদাঊদ হা/১৪৮১, ৮৮-৯০; নায়ল ৩/৩৫৪-৫৫; ফিক্বহুস সুন্নাহ ১/১৫৮; মির‘আত ৪/৩৬২, ৬৪। [6] . মির‘আত ৪/৩৬৫। [7] . মুত্তাফাক্ব ‘আলাইহ, মিশকাত হা/৫৮৪৭, ‘ফাযায়েল ও শামায়েল’ অধ্যায়-২৯, অনুচ্ছেদ-৪। [8] . নায়লুল আওত্বার ৩/৩৫৬, ‘ইস্তেখা-রাহর ছালাত’ অনুচ্ছেদ।

Posted from ইসলামী সাইট

Advertisements
This entry was posted in 09. বিভিন্ন ছালাতের পরিচয়, ছালাতুল ইস্তেখা-রাহ (صلوة الإسةخارة). Bookmark the permalink.

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s